সুনামগঞ্জ , শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬ , ৪ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
তুমি সব বোঝো মানি, যতটুকু বোঝো না ততটুকুই আমি দেশের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারেন কৃষকেরা : এমপি কয়ছর আহমদ হাওরে ‘নয়া দুর্যোগ’ জলাবদ্ধতা জনজীবনে শান্তি-নিরাপত্তা ফেরানোই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার সুনামগঞ্জের নতুন ডিসি মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান প্রাণের উচ্ছ্বাসে বর্ষবরণ শিক্ষা ক্ষেত্রেও সিলেটকে এগিয়ে নিতে হবে : শিক্ষামন্ত্রী দ্রোহে-প্রতিবাদে উদীচী’র বর্ষবরণ আসমানে মেঘ দেখলেই কৃষকের মনে শঙ্কা জেলা শিক্ষা অফিসার জাহাঙ্গীর আলমকে বিদায় সংবর্ধনা রেললাইন, শুল্ক স্টেশনসহ একগুচ্ছ দাবি সংসদে তুলে ধরলেন এমপি নূরুল ইসলাম আজ পহেলা বৈশাখ আগামী সপ্তাহে চিকিৎসা ও বাণিজ্যিক ভিসা চালু করছে ভারত ভাঙন রোধ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা মইনপুরে প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত ১ নববর্ষ হাওরবাসীর জন্য বয়ে আনুক মঙ্গলবার্তা সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার ফসল উৎপন্নের আশা যে ছয় কারণে ব্যর্থ হল যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা অধ্যাদেশ নিয়ে বিরোধীদল ইস্যু তৈরির চেষ্টা করছে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিএনপি সব জায়গায় নিজেদের লোক বসিয়ে ‘ক্যু’ শুরু করেছে : জামায়াত আমির

হাওরে ‘নয়া দুর্যোগ’ জলাবদ্ধতা

  • আপলোড সময় : ১৭-০৪-২০২৬ ০৯:৪১:০২ পূর্বাহ্ন
  • আপডেট সময় : ১৭-০৪-২০২৬ ১১:৫০:৪৫ পূর্বাহ্ন
হাওরে ‘নয়া দুর্যোগ’ জলাবদ্ধতা
* পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমি
* জলাবদ্ধতা রোধে পরিকল্পিত স্লুইচ গেইট নির্মাণের দাবি
বিশ্বজিত রায়, দেখার হাওর থেকে ফিরে ::
সুনামগঞ্জের বোরো ফসল রক্ষায় জলের সাথে একরকম যুদ্ধ করছেন লক্ষাধিক কৃষক। এতদিন অকাল বন্যা ও পাহাড়ি ঢল কৃষকের দুশ্চিন্তার কারণ হলেও এ বছর জলাবদ্ধতা ‘নয়া দুর্যোগ’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। পানি নিষ্কাশনের পথ না থাকায় এবার অন্তত ১০ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমি পানিতে তলিয়েছে। এ জন্য বাঁধ নির্মাণের দায়সারা কার্যক্রমকে দায়ী করছেন হাওরাঞ্চলের মানুষেরা।
জানা যায়, এবার হাওরের ধান বাঁচাতে প্রাণ খোয়ানোর ঘটনাও ঘটেছে। অপরিকল্পিত ও ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ গোটা হাওরাঞ্চলকেই চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
সম্প্রতি মধ্যনগর উপজেলার রূপেশ্বর হাওরের ফসল বাঁচাতে কয়েক গ্রামের কৃষক গুরমার হাওরের ৮ নম্বর উপ-প্রকল্পের শৌলডুয়ারি বাঁধ কেটে দেয়। গত ১২ এপ্রিল পানি নিষ্কাশনের পথ করতে গিয়ে বাঁধের তীর ধসে আরমান মিয়া (১৮) নিহত হয়েছেন। নিহত ওই তরুণ মধ্যনগর উপজেলার শালীয়ানি গ্রামের চানপর মিয়ার ছেলে। অসচ্ছল আরমানের পরিবারে এখনও মাতম চলছে। আরমান মিয়ার নিকটাত্মীয় আবুল হাসেম জানিয়েছেন, এ বছর তারা ১৫ কিয়ারের (৩০ শতকে ১ কিয়ার) মতো জমি বর্গাচাষ করেছিলেন। তার বেশির ভাগ জমির ফসলই ডুবে গেছে। ফসল বাঁচাতে আরমান বাঁধে নেমেছিল। শেষ পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এই বাঁধ কেড়ে নিল তাকে। কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জে জলাবদ্ধতায় প্রথমিকভাবে আক্রান্ত হয়েছে ৩ হাজার ১৮৯ হেক্টর জমি। এ বছর প্রায় ২ লাখ কৃষক ২ লক্ষ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করেছেন। এতে প্রায় ১৪ লক্ষ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। সুনামগঞ্জের ১২ উপজেলার ছোট-বড় ৯২টি হাওরে (১৪ এপ্রিল) মঙ্গলবার পর্যন্ত ১ হাজার ৪৭৩ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি অধিদপ্তর।
সুনামগঞ্জের হাওর এলাকায় কয়েক সপ্তাহের টানা বৃষ্টি সব হাওরে কমবেশি জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করেছে। যে কারণে হাজার হাজার হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়েছে। অনেক জায়গায় প্রশাসনের বাধ্য-বাধ্যকতা উপেক্ষা করে কৃষক নিজ উদ্যোগেই বাঁধ কেটে দিয়েছে। আবার কোন জায়গায় বাঁধ কাটতে বাধা দেওয়ায় কৃষকের মাঝে অসন্তোষ দানা বেঁধেছে। সেই উত্তেজনা দূর করতে গত রবিবার দেখার হাওরের উথারিয়া বাঁধে যান স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্তাব্যক্তিরা। পরে বাধ্য হয়ে উথারিয়া বাঁধ কাটতে নির্দেশনা দেয় প্রশাসন।
সুনামগঞ্জ সদর, শান্তিগঞ্জ, ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলা নিয়ে বিস্তৃত দেখার হাওরের মোট জমি ৪৫ হাজার ৮৫৯ হেক্টর। ২৪ হাজার ২১৪ হেক্টর আবাদযোগ্য জমিতে ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৪০ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন।
গত সোমবার সরেজমিনে গিয়ে দেখাযায়, দেখার হাওরের অভ্যন্তরে থইথই করছে মহাসিং নদী। সেই পানি আটকাতে জয়কলস ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি অংশে বাঁধ দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। এর মধ্যে উথারিয়া বাঁধ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ওই বাঁধ কেটে পানি নিষ্কাশনের পথ তৈরি করছেন কৃষকেরা। তবে নদীতে যে পরিমাণ পানি, তাতে বাঁধ কেটে দিয়েও হাওর ঝুঁকিমুক্ত হবে, তেমনটা মনে হয়নি।
সরেজমিনে দেখা যায়, দেখার হাওরে ধান কাটা তেমন শুরু হয়নি। এই হাওরে পুরোদস্তুর ধান কাটামাড়া শুরু হতে আরও সপ্তাহ-দশদিন সময় লাগবে। এর মধ্যে বৃষ্টি হলে আফর (নদীর তীরবর্তী উঁচু স্থান) উপচে তলিয়ে যেতে পারে হাওর। কোন কোন অংশ আফর ছুঁয়ে হাওরে পানি ঢুকার দৃশ্যও চোখে পড়েছে। দায়সারা বাঁধ ও কর্তৃপক্ষের নানা বাধ্য-বাধকতায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কৃষক। হাওরের গুজাউনি বাঁধ এলাকায় কর্তনকৃত ধানের আঁটি স্তূপ করছিলেন সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার দরিয়াবাজ গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমান। কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কারও মতামত ছাড়াই উথারিয়া বাঁধ দেওয়া হয়েছে। এই বাঁধ কাটার দাবি জানালেও কেউ শুনেনি। গুজাউনি বাঁধ ভাঙার পর কৃষক উত্তেজিত ভাব দেখালে সবাই বাঁধে আসেন এবং বাঁধ কাটার অনুমতি দেন। এরপরও বৃষ্টি দিলে হাওর রক্ষা করা সম্ভব হবে না।
অনেকের সাথে উথারিয়া বাঁধ কাটায় অংশ নেন শান্তিগঞ্জ উপজেলার জয়কলস ইউনিয়নের আস্তমা গ্রামের কৃষক নবিদ আলী। বাঁধে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ডুবরার (জলাবদ্ধতা) পানি আইয়া (এসে) জমি খাইলাইছে (ডুবে গেছে)। বান্ধ ভাইঙা (বাঁধ ভেঙে) দেওয়া যায় না। পিআইসি অখলতে (সবাই) না করে। এইখানও (এখানে) আমরার বহুত (আমাদের বহু) জমিন আছে। ডুইব্যা গেছে। এইখানে আমরার স্লুইচ গেইটের দরকার।

গুজাউনি বাঁধে পাহারারত লক্ষণশ্রী ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামের কবির আহমদ বলেন, খবর পাইয়া (পেয়ে) পাঞ্চাইত থাকি (গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে) বাঁশ, বস্তা, উরা, কোদাল লইয়া (নিয়ে) এলাকাবাসী আইয়া (এসে) বান্ধ আটকাইছন (বাঁধ রক্ষা করেছেন)। এইদিকে (নদী) পানি বেশি আছে, ওইদিকে (হাওর) পানি কম। যদি পানি নামার রাস্তা না পায় তাহইলে হাজার হাজার মানুষ পানিতে ডুইব্যা (ডুবে) মরব।
এ ব্যাপারে পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাশমির রেজা বলেন, এবার নয়া দুর্যোগ জলাবদ্ধতা। বৃষ্টির পানি রোধে স্লুইচ গেইট অপরিহার্য হলেও তার কোন পরিকল্পনা নেই। ফসল রক্ষার সংগ্রামে কৃষক বারবার নাস্তানাবুদ হচ্ছে। গবেষণা ও পরিকল্পনা ছাড়াই যত্রতত্র বাঁধ দিয়ে কৃষকদের বিপর্যয়ে মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এ থেকে পরিত্রাণ চায় হাওরবাসী।
সুনামগঞ্জ কৃষি অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, আগামী সপ্তাহে ধান কাটা পুরোপুরি শুরু হবে। পানি থাকায় মেশিনে ধান কাটা অনেকটা দুরূহ হবে। তবে সপ্তাহখানেক বৃষ্টি কম হওয়ায় পানি কমতে শুরু করেছে।
হাওরে শ্রমিক সঙ্কটের ব্যাপারে তিনি বলেন, জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় পাথর ও বালুমহাল বন্ধ রেখে শ্রমিকদের ধান কাটতে বলা হয়েছে। ধান পাকলে তা দ্রুত কেটে ফেলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে কৃষক ও কর্মকর্তাদের।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, বিগত সময়গুলোতে স্লুইচ গেইট নির্মাণ করা যাবে না, এ রকম নির্দেশনা ছিল। আমরা গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাছাই করেছি। স্লুইচ গেইটের পাশাপাশি বক্স আউটলেট দেওয়ার চিন্তা-ভাবনা আছে।

তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে এখন পর্যন্ত ৪০টি পয়েন্টে বাঁধ কাটা হয়েছে। পানি সরে গেলে দ্রুত বাঁধ বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশনা আছে কৃষকদের। হাওরের ফসল রক্ষায় আমাদের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha

কমেন্ট বক্স
হাওরে ‘নয়া দুর্যোগ’ জলাবদ্ধতা

হাওরে ‘নয়া দুর্যোগ’ জলাবদ্ধতা